যে রাজনীতির মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল ত্যাগ ও আদর্শ, তা আজ পরিণত হয়েছে ক্ষমতা ও অর্থের উন্মত্ত প্রতিযোগিতায়
'রাজনীতি' শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ জনকল্যাণ। অথচ বর্তমান বাংলাদেশে এই শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে দিন দিন পরিণত হচ্ছে ভীতি, ঘৃণা আর অনাস্থার প্রতিশব্দে।
১৯৭১ সালে যে দেশের স্বাধীনতার জন্য অগণিত মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, সেই দেশে আজ রাজনীতির নামে চলে কেবল ক্ষমতাবান হওয়ার প্রতিযোগিতা। যে রাজনীতির হওয়ার কথা ছিল ত্যাগের, তা আজ পরিণত হয়েছে ভোগের মহোৎসবে। প্রশ্ন জাগে — আমাদের রাজনীতি কেন এতটা পথভ্রষ্ট হলো?
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আদর্শ। কিন্তু গত কয়েক দশকে আদর্শিক লড়াইয়ের জায়গা দখল করে নিয়েছে পেশিশক্তি ও অর্থশক্তি। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মেধাবীদের চেয়ে 'বাহুবলী'দের কদর বাড়ছে। যেদিন থেকে যুক্তি-তর্কের বদলে লাঠি আর অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই নীতি ও আদর্শের রাজনীতি মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে।
রাজনীতি আর জনসেবার ক্ষেত্র থাকছে না — বরং পরিণত হচ্ছে উচ্চ মুনাফাসম্পন্ন এক ব্যবসায়িক বিনিয়োগে। মনোনয়ন কেনা থেকে নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি হয়ে উঠেছে টাকার খেলা। নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধির মূল লক্ষ্য থাকার কথা জনগণের সেবা। কিন্তু সেই আসনে পৌঁছাতে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়, তার বহুগুণ উসুল করার তাগিদই তখন বড় হয়ে ওঠে। এভাবেই রাজনীতি পচে যায় ভেতর থেকে তখন।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো পরমতসহিষ্ণুতা। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে বিরোধী মতকে দমন করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। রাজনীতি এখন 'আমরা বনাম ওরা' — এই দ্বন্দ্বে বিভক্ত। চরম মেরুকরণের ফলে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে উঠছে। সংলাপে অনীহা এবং একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা রাজনীতিকে কলুষিত করছে প্রতিনিয়ত।
যখন অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিতপালিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ রাজনীতির ওপর আস্থা হারায়। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। 'দলীয় ক্যাডার' সংস্কৃতি মেধাবী ও বিবেকসম্পন্ন মানুষদের রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
রাজনীতিকে এই পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন গুণগত পরিবর্তন — কেবল মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে। একটি দালানের ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়, তবে উপরে যত কারুকাজই করা হোক, তা একদিন ধসে পড়বেই। তাই সংস্কারের শুরু হতে হবে তৃণমূল থেকে।
পাড়ামহল্লা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে সৎ ও শিক্ষিত মানুষ নেতৃত্বে এলে উপরমহলে পেশিশক্তির দাপট কমে আসবে। স্থানীয় প্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত হয়। নিচ থেকে সুস্থ রাজনীতি শুরু হলে কেন্দ্রও জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে বাধ্য হয়।
এই পরিবর্তনের জন্য আরও প্রয়োজন:
- মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা
- নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নাতীতভাবে স্বচ্ছ করা
- রাজনীতি থেকে কালো টাকার প্রভাব দূর করা
- নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক মানুষকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার
রাজনীতি কোনো অপবিত্র বস্তু নয়। একে কলুষিত করেছি আমরাই — তাই মেরামত করার দায়িত্বও আমাদের। সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চা ছাড়া একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব।
মোঃ সাদের হোসেন বুলু।।

0 মন্তব্যসমূহ